সংবাদ :
জাতীয় : জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত- বাংলাদেশের আকাশে আজ পবিত্র জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ১০ জুলাই রবিবার সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হবে ইসলামিক বিশ্ব : আরাফাতে খুতবা দিবেন শায়খ ড. মুহাম্মাদ আবদুল করীম , হজের খুতবা সরাসরি সম্প্রচার হবে বাংলাসহ ১৪ ভাষায় আন্তর্জাতিক : আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় ৩য় স্থান অর্জনকারী সালেহ আহমদ তাকরিমকে সংবর্ধনা প্রদান করল ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন

  • টেক্সট সাইজ
  • A
  • A
  • A
  • |
  • রং
  • C
  • A
  • A
  • A

তিলাওয়াতে কুরঅানের মর্যাদা
প্রিন্ট
প্রকাশঃ : রবিবার ২২/০৪/২০১৮

তিলাওয়াতে কুরআনের ঐতিহ্য ও হাফেজে কুরআনের মর্যাদা
 

 পবিত্র কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহ্র কালাম, সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। কুরআন মজীদ যে নবীর উপর নাযিল করা হয়েছে তিনিও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ)। যে মাসে নাযিল হয়েছে সেই রমযান মাসও সর্বশ্রেষ্ঠ মাস। যে রাতে এ কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে সে রাতটিও সর্বশ্রেষ্ঠ রাত। যে রাতের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন মজীদে ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জান লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর সহস্র মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা ক্বদর-আয়াত-১,২ ও ৩)। তথাপি কুরআনের শিক্ষাদান ও গ্রহণকারী উভয়কেও (মানব জাতির মধ্যে) সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদাবান বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ)। তিনি ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি যে কুরআন মজীদ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।”-(বোখারী)। অপর বর্ণনায় রাসূল (সাঃ) কুরআন মজীদের তিলাওয়াতকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে অভিহিত করেছেন। কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত বর্ণনায় তিনি আরও ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের একটি হরফ পড়বে তার জন্য একটি ছওয়াব এবং একটি ছওয়াব দশটি ছওয়াবের সমতুল্য। সুতরাং প্রতি হরফে দশটি ছওয়াব মিলবে।”-(তিরমিযী)। আর রমযান মাসে তো প্রতিটি ছওয়াবে সত্তর গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। 
কুরআন তিলাওয়াতের মত এমন সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতটি এক সময় মুসলিম সমাজের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে জারী ছিল। ফজরের নামাজ আদায় করেই মুরব্বীরা কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হয়ে যেতেন। আর কোমলমতি শিশু-কিশোরেরা দল বেঁধে কুরআন বুকে ছুটে যেতেন মসজিদ-মক্তব পানে। সন্ধ্যা বেলায়ও ঘরে-বাড়িতে মুরব্বীরা সম্ভব হলে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং ছেলে মেয়েদের নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতে বসিয়ে দিতেন। ফলে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে সকাল-সাজে কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হতো। এলাকার অনেক নেক্কার শিক্ষিতা মহিলারা নিজেদের ঘরে পাড়া-পড়শীর আগ্রহী ছেলে-মেয়েদের কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা দিতেন। মক্তবে বা বাড়িতে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কচি-কাঁচা ছেলে-মেয়েদের নামায, তায়াম্মুম, ওজু ও গোসলের নিয়মসহ জীবন ঘনিষ্ঠ দু’আ ও জরুরী মাসায়েলের তা’লীম দিতেন। সেই সাথে মা-বাবার হক, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি ¯েœহ প্রদর্শনসহ জরুরী আদব-সভ্যতার তা’লীমও চলতো মক্তবে। আমি নিজেও বাল্যকালে মক্তবে পড়েছি এবং আমার সর্বকনিষ্ঠ খালা যিনি প্রত্যহ বাদে ফজর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কুরআনের তা’লীম দিতেন তাঁর কাছেও পড়েছি। 
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদান এবং ঘরে ঘরে তিলাওয়াতে কুরআনের যে ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকে জারী ছিল সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সকাল-সন্ধ্যায় পাড়া-মহল্লার ঘর-বাড়ি থেকে কুরআন তিলাওয়াতের সেই সুমধুর আওয়াজ এখন আর তেমন ভেসে আসে না। ভেসে আসে বিভিন্ন গান-বাজনার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। কোমল মতি শিশু-কিশোরদের ভোর-বিহানে কুরআন বুকে মক্তবপানে ছুটে চলার সেই সুন্দরতম পবিত্রতামুখর দৃশ্য এখন আর আগের মত দেখা যায় না। ভোরেই তাদের নিয়ে মা-বাবারাশুদ্ধ ছুটে যান বিভিন্ন আধুনিক শিক্ষালয়ে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কোমল কণ্ঠে সম্মিলিতভাবে কুরআন তিলাওয়াত, কালেমাসহ প্রয়োজনীয় দু’আ পাঠের সেই আওয়াজ এখন আর তেমন শুনা যায় না। তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তথাকথিত আধুনিকতা ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে কচি বয়সেই ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন ধরনের দেশী-বিদেশী, নৈতিকতা বিবর্জিত গান শিখছে। শিখছে নানা ধরনের কৌতুক। এভাবে নব প্রজন্ম নিমজ্জিত হচ্ছে অনৈতিকতার অতল গহ্বরে। ক্রমেই কুরআনের পথ থেকে বিচ্যুত হতে চলেছে সমাজ। 
এমন ক্রান্তিকালেও আমরা আশাবাদী হই হেফ্জখানাগুলো এবং এখনো চালু থাকা মক্তব (যদিও আগের মত প্রাণবন্ত নয় বা শিক্ষার্থী সংখ্যা অপ্রতুল) সমূহের দিকে তাকিয়ে। বিশেষত: হেফ্জখানা সমূহে অবিরত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত চলছে। যেখান থেকে প্রতি বছর অসংখ্য হাফেজে কুরআন তৈরী হয়ে কুরআনের খেদমতে নিবেদিত হচ্ছেন। হাফেজ সাহেবানদের অবদানে কুরআন নাজিলের মাস রমযানুল মোবারকে আমরা তারাবীহ্র নামাজে পুরো কুরআন মজীদ শুনার অবারিত সুযোগ লাভ করে থাকি। তাঁদের সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজে রমযান মাসে মসজিদগুলো অধিকতর প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। মু’মিন অন্তরে সৃষ্টি হয় তাকওয়ার আবহ। শাণিত হয় ঈমানী স্পৃহা। যেমনটি বলেছেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা “মু’মিনতো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহ্কে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে।” (সূরা আনফাল-আয়াত-০২)। 
পবিত্র কুরআনের হাফেজ সাহেবদের মান-মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হয় সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর হাদীস থেকে। যেটি শুরুতে উল্লেখ হয়েছে। রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি যে কুরআন মজিদ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।” (বুখারী)। তিনি আরও ইরশাদ করেন, “ছাহেবে কুরআন তথা যিনি কুরআন শিখল এবং তার ওপর আমল করল (কিয়ামতের দিন) তাঁকে বলা হবে পড় এবং মর্যাদার স্তরে উন্নীত হও, আর ধীরস্থিরভাবে পড় যেভাবে তুমি দুনিয়াতে পড়তে। কেননা তোমার মর্যাদার স্তর ওই আয়াতের সমাপ্তির ওপরই যে আয়াত পর্যন্ত তুমি পড়বে।” (আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ)। বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) আরও ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়ল এবং তার ওপর আমল করল, আর হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম জেনেছে তাঁকে আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর পরিবারের এমন দশ জন ব্যক্তির ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করা হবে যাদের জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গিয়েছিল।” (আহমদ, তিরমিযী, ইব্নে মাজাহ)। হাফেজে কুরআনগণের মর্যাদার সাথে সাথে তাঁদের পিতা-মাতাকেও কিয়ামতের ময়দানে নূরের তাজ পরিধান করানো হবে বলে হাদীস শরীফে এসেছে। কারণ হাফেজ সাহেবানরা আল্লাহ্পাকের বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত বিরল প্রতিভার অধিকারী। তাইতো তাঁরা আল্লাহ্পাকের ৩০ পারা কুরআনের আমানত বক্ষে ধারণ করার তাওফিক লাভ করেছেন। তাঁদের অন্তর কুরআনের আলোয় আলোকিত আর চেহারা ঈমানের জ্যোতিতে দীপ্তিমান। তাই হাফেজে কুরআনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সকলেরই উচিত। যাদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদার ঘোষণা স্বয়ং রাসূল (সাঃ) দিয়েছেন, যাদেরকে কিয়ামতের ময়দানে খোদ মহান আল্লাহ্ তা’আলা সম্মাননায় ভূষিত করবেন, সেই হাফেজে কুরআনগণের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শন করা কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল। আর তাঁদের অবমাননা পবিত্র কুরআনেরই অবমাননার শামিল। 
কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কুরআনের ভাষায়, রাসূল (সাঃ) এর দৃষ্টিতে যারা শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় অভিসিক্ত সেই ওলামায়েক্বেরাম ও হাফেজে কুরআনগণ সমাজে আজ অবহেলার শিকার। জাগতিক কৃতিত্ব অর্জনের জন্য বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন আঙ্গিকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ট ঘোষণা দিয়ে সরকারী-বেসরকারী ভাবে পুরস্কার সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। অপরদিকে আল্লাহ্র কালাম ৩০ পারা কুরআনের হিফ্জ প্রতিযোগিতায় শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়; আর্ন্তজাতিক পরিম-লেও ১ম, ২য় হওয়ার মতো গৌরব অর্জন করে আমাদের দেশের অনেক কিশোর হাফেজে কুরআন স্বদেশের ভাব-মর্যাদাকে বিশ্ব সভায় সমুন্নত করেছেন। কিন্তু তাদেরকে সরকারীভাবে জাতীয় পর্যায়ে সংবর্ধিত করার (নামমাত্র উদ্যোগ ছাড়া) উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ তেমন পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি অনেক পত্রিকায় সেই কৃতিত্বের খবরটিও ছাপা হয় না, হলেও তা অত্যন্ত গৌণভাবে। অনেক কণ্ঠশিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু ক্বারী ওবাইদুল্লাহর মতো কুরআন তিলাওয়াতের প্রাণপুরুষ, যিনি জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ বেতার, বিটিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলের অন্যতম ক্বারী ছিলেন, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৮ বছর যাবৎ বাকরুদ্ধ। সেই থেকে তিনি অসুস্থ। ফলে মাহে রমযানে সাহ্রীর সময় বেতার অনুষ্ঠান থেকে ক্বারী ওবাইদুল্লাহ্র দরাজ কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি আর ভেসে আসে না। সব কথাই তিনি বুঝেন, শুনেন, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করার শক্তি তাঁর নেই। এখন তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে নীরবে, বলতে না পারার যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে। তাঁর এ রকম অসুস্থতার খবর বেশ ক’বছর পূর্বে দু’-একটি পত্রিকায় একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছিল (জানি না এখন তিনি কেমন আছেন)। কিন্তু যাঁর কুরআন তিলাওয়াতে এক সময় মুখরিত হতো সংসদ ও বঙ্গভবন। যাঁর কৃতিত্বে আন্তর্জাতিক পরিম-লে সমুন্নত হয়েছে দেশের মর্যাদা। যিনি সুদীর্ঘ ৪০ বছর চকবাজার ঐতিহ্যবাহী শাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন এই বরেণ্য আলেম ও খাদেমে কুরআনের চিকিৎসায় সরকারের এগিয়ে আসায় কোন খবর আমরা পাইনি। 
এভাবে কুরআনের খাদেমগণ, হাফেজ সাহেবানরা যাতে অবহেলিত না হন, কোনভাবে যাতে তাঁদের অবমাননা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। হাফেজ সাহেবদেরও উচিত যেহেতু তাঁদের অন্তরে পবিত্র কুরআনের আমানত সংরক্ষিত সেহেতু কোনভাবে যাতে তাঁর খেয়ানত না ঘটে, অবমাননা না হয় সেভাবে জীবন যাপন করা এবং কুরআনের তিলাওয়াত জারী রাখা। 
আসুন! আমরা কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিখি, কুরআনের শিক্ষা আহরণে মনোনিবেশ করি, কুরআনের হাফেজ, আলেম ও ক্বারী সাহেবানদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। কুরআনের শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের একনিষ্ঠ সহযোগী হই। সর্বোপরী কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাজ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করি।

৪৫৬

কোন তথ্যসূত্র নেই

আপনার জন্য প্রস্তাবিত

ইসলামিক ফাউন্ডেশন

To preach and propagate the values and ideals of Islam, the only complete code of life acceptable to the Almighty Allah, in its right perspective as a religion of humanity, tolerance and universal brotherhood and bring the majority people of Bangladesh under the banner of Islam

অফিসিয়াল ঠিকানা: অফিসিয়াল ঠিকানা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, আগারগাঁও, শের-এ- বাংলা নগর, ঢাকা -১২০৭